(আষাঢ় ১৪২১, মেদিনীপুর, বর্ষ ১, সংখ্যা ১)
![]() |
| ১.১ - নারী সুরক্ষা |
বর্তমান সময়, যাকে ইংরেজিতে বলে 'প্রেজেন্ট টাইম' | আমরা সব সময় বর্তমানের সঙ্গে চলায় অভ্যস্ত | সেইজন্য একটি কথার প্রচলন আছে | "সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের ন্যায়" | বলা হয় নদইয়ের জল ও ঘড়ি কারোর জন্যে অপেক্ষা করেনা | প্রকৃতির নিয়মে মানুষের মন বেশিদিন অতীতের স্মৃতিকে ধরে রাখতে পারেনা | মন থেকে স্বাভাবিক নিয়মে ভুলে যায় |
আমরা প্রায় মন থেকে ভুলতে বসেছি সাহসিনী দিল্লীর 'দামিনীর' কথা | সে অত্যাচারিত হয়ে সিঙ্গাপুর হাসপাতালে নিজের প্রাণ ত্যাগ করেছিল | বলেছিল; 'মা, ম্যায় জিনা চাহতা হু' | তার মধ্যে আমরা নিজের বোন, আত্মার আত্মীয়তাকে খুঁজে পেয়েছিলাম | তার আত্মার সাথে আমাদের আত্মার একাত্মতা অনুভব করেছিলাম | সেইজন্যে রাজনীতি বহির্ভূত যুব সমাজ নির্ভীক, অহিংস আন্দোলনে এগিয়ে এসেছিলো প্রচন্ড কনকনে দিল্লীর দুই ডিগ্রী ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে | যুব সমাজ দাবি করেছিলো অত্যাচারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ফাঁসি | সেইসময় বুদ্ধিজীবি ব্যক্তিত্বরা তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছিলেন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, সামাজিক সাইটগুলিতে |
তারা একে দেশের লজ্জা রাজধানীর রাজনীতির লজ্জা বলে ব্যক্ত করেছিলেন | সারমর্ম উঠে এসেছিল শুধু শক্তি দিয়ে নয়, প্রয়োজন আমাদের মনের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন | প্রয়োজন আমাদের মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন | বিভিন্ন চিত্রঅভিনেতা, চিত্রাভিনেত্রী, চিত্রপরিচালক এতে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন | বুদ্ধিজীবি মহল এই মতামত ব্যক্ত করাই নয়, চিন্তাভাবনাও ব্যক্ত করেছিলেন | কিভাবে এই সামাজিক অবক্ষয়্তার পরিবর্তন করা যায় | কিন্তু আমরা আমাদের দেশের ভারতবর্ষের প্রাচীন জিনিস, ভারতবর্ষের সম্পদ, যার জন্যে আমরা নিজেদের ভারতবাসী বলে গর্ব অনুভব করি | আধ্যাত্মিক শিক্ষার তথা মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনা | বলা হয়ে থাকে ভারতবর্ষ আধ্যাত্মিক শক্তিতে সম্পন্ন দেশ | আজকে তার অভাবের জন্যই সমাজে ধর্ষনের মতো ঘটনা ঘটছে | পরিসংখ্যান অনুসারে বলা হয়ে থাকে ভারতবর্ষে প্রতি বাইশ মিনিটে একজন করে নারী ধর্ষিতা হন | শুধু দিল্লীর ঘটনা নয়, নারী ধর্ষিতা হন প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে, কর্মস্থলে, বসে-ট্রেনে-বিদ্যালয়ে | তাই শুধু বুদ্ধিজীবি মহলকে মতামত ব্যক্ত করে নয়, প্রয়োজন দৃঢ়তার সাথে এই সামাজিক অবস্থার, মানসিকতার পরিবর্তনের জন্য শপথ নেওয়ার | সেইজন্যে প্রতিটি দেশবাসীর, নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রয়েছে | চিত্র নির্মাতাদের, ইন্টারনেট কারবারীদের এইজন্যে সচেতন হওয়া প্রয়োজন | কারণ প্রতি মুহুর্তে সিনেমায়, টিভিতে, ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপনে যৌনতাকে প্রাধান্য দেওয়ায় সমাজে এই প্র্বপ্ন্প্তাকে বৃদ্ধি করেছে | সেইজন্যে একমাত্র সুরাহা ভাঅর্ত্বর্ষের মূল শিক্ষা; আধ্যাত্মিক শিক্ষাতে সকলকে শিক্ষিত হতে হবে | তবেই প্রকৃত নারীর সুরক্ষা সম্ভব হবে |
----------------------------------------
( জনশিক্ষা ) আবু কা আদম ![]() |
| ১.২ - ব্রহ্মা |
অনেক অনেক দিন আগে, একজন মহৎ প্রাণ লক বাস করত যাকে ডাকা হত আদম নামে | তাকে 'আবু-কা আদম' নামেও ডাকা হত | কারণ তিনি আবুতে বসবাস করতেন | তিনি ছিলেন স্নেহপ্রবন, ভদ্র এবং দিব্য পুরুষ | তিনি সকলকে খুব গভীরভাবে ভালবাসতেন, এবং লোকেরাও তাঁকে খুব ভালোবাসতো | তিনি সকলকে সাহায্য করতেন এবং কখনো কারোর খারাপ চাইতেন না | তিনি সর্বোচ্চ পিতা ঈশ্বরকে মহৎ ভালবাসতেন |
একদিন, তিনি ঘুমের মধ্যে দেখলেন, একজন শ্বেত বস্ত্রধারী দেবদূতকে যিনি কিছু লিখছিলেন একটি রৌপ্য পাত্র হাতে ধরে | আদম সেই দেবদূতকে জিজ্ঞেস করলেন "আপনি কি লিখছেন?" দেবদূত মৃদু হেসে বললেন "আমি তাদের নাম লিখছি যারা ভগবানকে ভালবাসে |" আদম উত্সাহভরে দেবদূতকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তার নাম আছে কিনা, দেবতা উত্তর দিলেন 'না' এবং অদৃশ্য হয়ে গেলেন | আদম পরের দিনটি এই ভেবে কাটাল যে দেবদূতের তালিকায় ভগবানকে ভালবাসার তালিকায় তার নাম কেন নেই | সেই রাত্রে যখন সে ঘুমোলো আবার সে দেখল সেই দেবদূত একটি স্বর্ণপাত্রে কিছু লিখছে | আদম জিজ্ঞাসা করলো, "দেবদূত আপনি আজ কি লিখছেন?" দেবদূত একটি বড় হাসি হেসে বলল; - "আমি সেই ভাগ্যশালী ব্যক্তিদের নাম লিখছি যাদের ভগবান ভালবাসেন | পুনরায় আদম জিজ্ঞেস করলো তার নাম সেই তালিকায় দেখা যাচ্ছে কিনা | দেবদূত উত্তর দিল "তোমার নাম তালিকার প্রথমে স্থান পেয়েছে |" এই বলে দেবদূত অদৃশ্য হয়ে গেলেন | আদমের এক আনন্দানুভূতি হল |
এখন আপনারা কি জানতে চান সেই আদম বাস্তবে কে ছিলেন? তিনিই সেই ব্যক্তি আদম যিনি পরিচিত প্রজাপতি ব্রহ্মা নামে | 'আদি দেব' আদম, বা বাবা আদম, মনুষ্যত্বের পিতা, যিনি মাউন্ট আবুতে বসবাস করেন |
--------------------------------------------
(প্রবন্ধ) নারী থেকে নারায়ণী ![]() |
| ১.৩- নারী নারায়ণী |
যেভাবে কোনো পাখি এক পাখায় উড়তে পারেনা, সেইভাবে কোনো সমাজ বা দেশ স্ত্রী বা পুরুষ দুটোর কোনো একটি বর্গ দ্বারা উন্নত হতে পারে না | নর-নারীর মধ্যে যদি কিছু ভিন্নতা থাকে, তাহলেও একে অপরের বিরোধী নয় বরং পরিপূরক |
ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই পারস্পরিক পুরকের স্বরুপকে বিষ্ণু চতুর্ভুজ তথা মহালক্ষীর রূপে দেখিয়েছে |
আমরা এভাবে শরীরের চোখের ভিন্নতা করতে পারব যে; ডান দিকের চোখ শ্রেষ্ঠ বাম দিকের নয় বা বাম দিকের চোখ শ্রেষ্ঠ ডান দিকের নয় | উভয়ই শ্রেষ্ঠ | উভয়ের মাইল শরীরের সৌন্দর্য্য তৈরী হয় | উভয়ের সহযোগেই দেখার প্রক্রিয়া পূর্ণ হয় |
এক চোখ যুক্ত মানুষকে অন্ধ বলা হয় | এইভাবে পুরুষ বা নারী উভয়ের মধ্যে যদি একটি বর্গের সঠিক বিকাশ না হয় তাহলে সমাজ ও দেশ অন্ধ হয়ে যায় |
ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রে নারীকে নরের অর্ধাঙ্গিনী বলা হয়েছে | স্বন্ধ পুরানেই লেখা আছে; "য হেবীয় যচ্চ ভর্তুশুক্রজৈচ" এর অর্থ যে স্বামী যা কিছু দান, সেবা, সত্কার, ধর্ম-পুণ্য ইত্যাদি করে তার আধা ফল বিনা চেষ্টাতে স্ত্রীর প্রাপ্ত হয় | কারণ সে তার অর্ধাঙ্গিনী | নির্ণয়ামৃততে লেখা আছে পত্যব্রতাং ক্যুর্জাদি ভার্জাযস্য পতিব্র্তম | অর্থাৎ স্ত্রী স্বামীর জন্যে ব্রত করবে |
আমাদের পুর্বজেরা নারীকে অর্ধাঙ্গিনী বলেছেন | এর তাৎপর্য এই নয় যে স্বামী তার মৌলিক গুণগুলোকে আকর্ষণ করবে | তার উন্নতির পথে বাধা হবে | তার সদ ইচ্ছেকে অগ্রাহ্য করে তাকে অধ্যাত্মিক বা ধার্মিক উন্নতি থেকে বঞ্চিত করে দেবে | যদি কেউ এরকম করে তাহলে সে অর্ধেক অঙ্গকে দুর্বল করে দেয় | নারী রক্ষনীয় অবশ্যই কি উপেক্ষনীয় বা শোষনীয় নয় |
এইভাবে পরস্পর পরিপূরক | নারী আর নর একে অপরের পরাধীন নয় | একজন না থাকলে দ্বিতীয় জন বরাবর কাজ করে দেখায় | তাকে দ্বিতীয়জনের অভাব পূরণ করতে দেখা গিয়েছে |
গৃহস্থ আশ্রমকে অন্য সকল আশ্রমের ( ব্রহ্মচর্য, বানপ্রস্থ, এবং সন্ন্যাস ) থেকে বড় মনে করা হয়েছে -- কেন? কারণ, শেষ তিন আশ্রমের ভরণ-পেষণ'এর দ্বারা হয় | এইজন্যে ভারতবর্ষে প্রাচীনকালে গৃহস্থ ব্যক্তিরা মোট আয়ের দশ ভাগ ডান-পুন্যতে লাগাতেন | অতএব সত্যিকারের অর্থে গৃহস্থ'ও এক তপোবন, যেখানে জীবন তপস্যাময় | সকলপ্রকার পরিস্থিতিতে সেবা, পরোপকার, ধর্ম, পরের কল্যানের পথে চলে ত্যাগ, সহনশীলতা, ধৈর্য, জাগরুকতা এবং দূরদর্শিতা ধারণ করে ঘরকে সুখী বানানো যেতে পারে |
যদি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় তাহলে নারী পুরুষের থেকে শ্রেষ্ঠ সিদ্ধ হয়, কারণ পরমাত্মাকে পরম পুরুষরূপে স্মরণ করে নিজেকে তার প্রেমিকা মনে করে | তার প্রেমালিঙ্গন প্রাপ্ত করা তার জন্য অনেক সহজ | কিন্তু নরকে পরমপুরুষের প্রেমালিঙ্গন প্রাপ্ত করার জন্যে নারী হওয়া জরুরী | এবং পুরুষে গর্বকে পরিত্যাগ করা প্রয়োজন | এখন দেহের অভিমান উভয়কেই ছাড়তে হবে | আত্ম্সব্রুপে উভয়কেই স্থির হতে হবে | তাহলেই পরমপুরুষের সামনে সর্বস্ব সমর্পণ করা নারীর জন্যে স্ব্ভাবানুসারে সহজেই হয়ে যায় | পুরুষের মধ্যে যখন মহিলার গুণ এসে যায় তখন সে মহাত্মা হয়ে যায় | প্রাচীনকালে কন্যার লালন-পালন পুত্রেরই সমান হত | স্মৃতিস্বরূপ শাস্ত্র রামায়ণে লেখা আছে যখন রাজা জনক সীতার কোলে উঠলেন তো অনুভব করলেন তাঁর মতো সুখী ব্যক্তি সংসারে আর কেউ নেই |
....... চলবে


